22 C
Dhaka
Friday, December 9, 2022

Buy now

নামেই মাদক নিরাময় কেন্দ্র, আড়ালে মাদকের ব্যবসা (ভিডিও)

গাজীপুরে ভাওয়াল মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে অবাধে চলত মাদকের কারবার। সেখানে ভর্তি হওয়া রোগীদের আটকে রেখে নির্যাতন ও অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হতো বলে ওই নিরাময় কেন্দ্রের মালিক ফিরোজা নাজনীন ওরফে বাঁধনের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ উঠেছে।

এমনকি একজন চিত্রনায়ককে আটকে রেখে নির্যাতন করা হতো বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। র‌্যাব অভিযান চালিয়ে ওই নিরাময় কেন্দ্রের মালিক ফিরোজা নাজনীন ওরফে বাঁধনসহ ৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

বুধবার দুপুরে রাজধানীর মোহাম্মদপুর বসিলায় র‌্যাব-২ কার্যালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন এসব তথ্য জানান।

এ সময় র‌্যাব-২ এর কমান্ডিং অফিসার (অধিনায়ক) লে. কর্নেল আবু নাঈন মোহাম্মদ তালাত, র‌্যাব-২ এর মিডিয়া শাখার এএসপি মোহাম্মদ ফজলুল হকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, মাদক নিরাময় কেন্দ্রের আড়ালে মাদক ব্যবসা, রোগীদের শারীরিক নির্যাতন, প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় ভর্তি রেখে অর্থ আদায় এবং অনৈতিক কার্যক্রমে জড়িত থাকার অভিযোগে তাদের আটক করা হয়েছে।

এর আগে মঙ্গলবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মহানগরের ভুরুলিয়ার কালাসিকদারের ঘাট এলাকায় ‘ভাওয়াল মাদকাসক্ত পুনর্বাসন কেন্দ্র’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানে র‌্যাব ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর অভিযান চালায়। ওই পুনর্বাসন কেন্দ্রের মালিক ফিরোজা নাজনীন বাঁধনসহ পাঁচজনকে আটক করে র‌্যাব। ওই কেন্দ্র থেকে ৪২০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। কেন্দ্রটি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সিলগালা করে দিয়েছে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন মঙ্গলবার বিকালে ওই কেন্দ্রের সামনে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে গোপন সূত্রে খবর পেয়ে নগরীর ভাওয়াল মাদকাসক্ত পুনর্বাসন কেন্দ্র নামক একটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালানো হয়।

সেখানে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রোগী জানান, কেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীকে কেন্দ্রের মালিক ফিরোজা নাজনীন বাঁধনের পছন্দ হলে তার ওপর যৌন নির্যাতন চালানো হতো।

অপর এক রোগীর মা জানান, তার ১৬ বছরের একমাত্র ছেলে সাত মাস ধরে এ কেন্দ্রে অবস্থান করছে। এজন্য তার কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে; কিন্তু ওই ছেলে নিরাময় কেন্দ্র ছেড়ে আর বাড়ি ফিরে যেতে চাইছিল না।

বুধবার প্রেস বিফিংয়ে আরও জানানো হয়, গ্রেফতারকৃত ফিরোজা নাজনীন ওরফে বাঁধন তার প্রথম স্বামীর সঙ্গে ডিভোর্স হওয়ার পর সিপনের সঙ্গে দ্বিতীয় বিবাহ সম্পন্ন হয় বলে জানান। সিপন তার সঙ্গে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে বসবাস করতেন। কিন্তু তাদের বিয়ের কোনো বৈধ নথিপত্র তিনি দেখাতে পারেনি। তিনি (বাঁধন) তার অবৈধ কার্যক্রমকে আড়াল করার জন্য নিজকে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতেন।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, গ্রেফতার মনোয়ার হোসেন ওরফে সিপনের গ্রামের বাড়ি গাজীপুর। তিনি বাঁধনের প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন। সিপন ২০১৬ সালে অস্ত্র মামলায় গ্রেফতার হয়। তার বিরুদ্ধে সর্বমোট ২টি মামলা রয়েছে।

এ বিষয়ে র‌্যাব-২ এর এএসপি মোহাম্মদ ফজলুল হক জানান, গ্রেফতার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সদর থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনসহ দুই আইনে পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে।

র‌্যাবের আইনও গণমাধ্যম শাখার প্রধান কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, গত ১ জানুয়ারি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সমিতির পক্ষ থেকে র‌্যাব-২ এর নিকট অভিযোগ করা হয়- একজন চিত্রনায়ক দীর্ঘদিন যাবত তাদের কার্যক্রমের অনুপস্থিত রয়েছেন। পরবর্তীতে তারা জানতে পারেন, ওই চিত্রনায়ককে গাজীপুর সদরের ভাওয়াল মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রে আটক রেখে নির্যাতন করা হচ্ছে। এমন অভিযোগের ভিত্তিতে র‌্যাব সেখানে অভিযান চালায়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত ফিরোজা নাজনীন ওরফে বাঁধন র‌্যাবের কাছে স্বীকার করেন, তিনি ২০০৯ সালে ভাওয়াল মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রটি অনুমোদনহীনভাবে প্রতিষ্ঠা করেন; যা পরবর্তীতে ২০১৩-২০১৪ সালে সাময়িক অনুমোদন প্রাপ্ত হয়।

তিনি আরও দাবি করেন, এই প্রতিষ্ঠানের মালিক তিনি নিজেই; যার কর্মী সংখ্যা ৪ জন এবং রোগীর সংখ্যা বর্তমানে ২৮ জন। তিনি যে ভবনটিতে থাকতেন সেটির ভাড়া বাবদ প্রতি মাসে ৪০ হাজার টাকা বাড়ির মালিককে পরিশোধ করতেন।

ভিকটিমদের উদ্ধৃতি দিয়ে র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখার এই কর্মকর্তা জানান, ধৃত ফিরোজা নাজনীন ওরফে বাঁধন প্রতি রোগীর কাছ থেকে মাসিক চার্জ হিসেবে ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা করে আদায় করতেন। নিরাময় কেন্দ্রে ২ জন চিকিৎসক থাকার কথা বললেও কোনো চিকিৎসককে সেখানে পাওয়া যায়নি। সেখানে ২০ জন রোগীর চিকিৎসার অনুমোদন থাকলেও ২৮ জন রোগী পাওয়া যায়।

মঙ্গলবার আটক পাঁচজনের নামে বুধবার সন্ধ্যায় সদর মেট্রো থানায় র‌্যাবের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হয়েছে। সদর থানার ওসি (তদন্ত) রাফিউল ইসলাম রাফি বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

মামলার আসামিরা হলেন- ভাওয়াল মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রের মালিক লালমনিরহাট জেলার মৃত জহির হোসেনের মেয়ে ফিরোজা নাজনীন ওরফে বাঁধন, গাজীপুর জেলার নাজিম উদ্দিনের পুত্র মনোয়ার হোসেন ওরফে সিপন, একই জেলার আবুল খানের পুত্র মো. রায়হান খান, টাঙ্গাইল জেলার মৃত খগেন্দ্র মোহন শাহ পুত্র দিপংকর শাহ ওরফে দিপু ও মৃত আনোয়ার হোসেনের পুত্র জাকির হোসেন আনন্দ। তারা ওই কেন্দ্রের কর্মচারী। এ সময় তাদের কাছ থেকে ৪২০ পিস ইয়াবা, নির্যাতনে ব্যবহৃত লাঠি, স্টিলের পাইপ, হাতকড়া, রশি, গামছা, খেলনা পিস্তল উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনার পর তাৎক্ষণিকভাবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ভাওয়াল মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রের সব কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছেন।

সম্পর্কিত আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

অনুস্মরণ করুন

5,535FansLike
1,200FollowersFollow
2,000SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ নিউজ