30 C
Dhaka
Saturday, July 2, 2022

Buy now

সুখী দাম্পত্য জীবনের পাঁচ রহস্য: রাসূলের নীতি

সুখী দাম্পত্য জীবনের পাঁচ রহস্য: রাসূলের নীতি

শাইখ আহমাদ কুট্টি; অনুবাদ: তাহারাতুন তাইয়্যেবা

 

বিয়ে নানাভাবে আমাদের জীবনে ভূমিকা রাখে। এমনকি এটা আমাদেরকে সুখী করে, পূর্ণতা এবং আনন্দে ভরিয়ে দেয়।
আপনি জিজ্ঞাসা করতে পারেন, কীভাবে?
আমাকে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে দিন৷
যখন আমি বলি বিয়ের মাধ্যমে অনেককিছু সম্ভব, এটি দ্বারা সুখী এবং পরিপূর্ণ হওয়া যায়- তার মানে এটা নয় যে এই পথটি খুব সহজ কিংবা জাদুর পরশে ব্যাপারগুলো ঘটে!
বিয়ের মাধ্যমে কিছু পেতে হলে আমাদেরকে এর জন্য সময় এবং শক্তি ব্যয় করতে হবে৷ এর জন্য আমাদের সচেতনভাবে কাজ করা প্রয়োজন। আল্লাহর প্রতি ভরসা রেখে যখন আমরা আমাদের সর্বোচ্চটুকু দেয়ার চেষ্টা করব, অবশ্যই তখন একটি সাফল্যজনক ফলাফল লাভে সক্ষম হবো।
আল্লাহ বলেন:

“যদি তারা উভয়ে নিষ্পত্তির ইচ্ছা রাখে, তাহলে আল্লাহ তাদের মধ্যে মীমাংসার অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি করে দেবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবিশেষ অবহিত।”
(সূরা নিসা; আয়াত: ৩৫)

অন্যভাবে বলতে গেলে, আল্লাহর আইনগুলো স্পষ্ট: আমরা জীবনে তাই পাই যেটার জন্য আমরা চেষ্টা করি: আমাদের দৈনন্দিন চিন্তাভাবনা, কথা এবং কাজ- হয় আমাদের বিয়েকে গড়বে বা ভেঙে দেবে। যেসব চিন্তা, কথা এবং কাজ আমরা ধারাবাহিকভাবে লালন করি, সেগুলোর মাধ্যমেই আমরা আনন্দ কিংবা দুঃখের সমুদ্রে দিন কাটাই।
সুতরাং, একটি সুখী দাম্পত্য জীবন গড়ে তোলা আমাদের ক্ষমতার অন্তর্ভুক্ত: প্রত্যেক দম্পতিকে একটি চাবিকাঠি আয়ত্তের মাধ্যমে এটি করা দরকার: এর জন্য প্রয়োজন প্রতিশ্রুতি, এবং আমাদের মধ্যকার সমস্ত আধ্যাত্মিক এবং আবেগীয় বিষয়ের সংমিশ্রণে আন্তরিক চেষ্টা, এবং প্রচুর দু’আ করা।
বিয়ের ক্ষেত্রে আমার জীবনব্যাপী অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমি চার দশকেরও বেশি আগে অস্বাভাবিক কম বয়সে বিয়ে করেছি; সততার সাথে বলতে পারি যে আমি এই মৌলিক সূত্র অনুসরণ করে আমার বিবাহিত জীবন অতিবাহিত করেছি। আমি ইমাম হিসেবে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন পারিবারিক সমস্যা মোকাবেলা করেছি।
একটি সফল বিয়ের জন্য আমার রেসিপি হলো নবীজীর নীতির প্রতিফলন: নবীর অনুকরণীয় চরিত্র একটি সুখময় বিবাহিত জীবনের জন্য আমার প্রচেষ্টায় সহায়তা করেছে। আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীনের পরে দ্বিতীয় এবং জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে রাসূল (সা) আমার জন্য সবচেয়ে বেশি সহায়ক। আমি রাসূলের প্রজ্ঞা- ‘সি’ দিয়ে শুরু হওয়া কয়েকটি মূল শব্দে সংযুক্ত করব: সংযোগ, সাহচর্য, সহানুভূতি, সমঝোতা এবং সন্তুষ্টি।
সংযোগ

‘সংযোগ’ দিয়েই শুরু করা যাক। বিবাহিত দম্পতিদের মধ্যকার সম্পর্ক মোহ অথবা কেবলমাত্র শারীরিক আকর্ষণের উপর ভিত্তি করে হতে পারে না, কিংবা ঠুনকো কিছুর উপর গড়ে উঠতে পারে না; বরং এটি অবশ্যই আল্লাহ এবং বান্দার সাথে সংযোগের উপর ভিত্তি করে হতে হবে। আল্লাহর সাথে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে আমরা আমাদের ক্ষুদ্র ও স্বার্থপর চাহিদা, আকাঙ্ক্ষা এবং দুশ্চিন্তাকে অতিক্রম করে মূল্যবোধের একটি উচ্চ উৎসের সাথে সংযুক্ত হই।
এর মাধ্যমে আমরা একটি দৃঢ় ভিত্তির উপর বিয়েকে দাঁড় করাতে পারি। আমাদের নিজেদের আবেগের কারণে নয়, বরং আল্লাহর প্রতি আমাদের যৌথ অঙ্গীকারের কারণে একে অপরের সাথে সংযুক্ত হয়ে যাই। এমনকি তাওহিদ বা এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস আমাদের চারপাশের সবকিছুর সাথে আমাদেরকে যুক্ত করলেও, এটি একটি দম্পতির বন্ধনকে পুষ্ট এবং শক্তিশালী করার এক অনন্য উপায়। বিশ্বাস এবং আল্লাহর উপর ভরসার মাধ্যমে বিয়ে একটি আধ্যাত্মিক বন্ধন স্থাপন করে যেটি তারা লালন করে এবং যার উপর নির্ভর করে তারা জীবনের চ্যালেঞ্জগুলির মুখোমুখি হয়। অতএব, তাদের সম্মিলিত প্রার্থনা:

“এবং যারা বলে, হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে এবং আমাদের সন্তানের পক্ষ থেকে আমাদের জন্যে চোখের শীতলতা দান কর এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের জন্যে আদর্শস্বরূপ কর।”
(সূরা ফুরকান; আয়াত: ৭৪)

যারা তাওহীদের ভিত্তিতে একে অপরের সঙ্গী হয়, তাদের মূল লক্ষ্যই থাকে একত্রে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। এটাই আমাদেরকে সুখময় বিয়ের দ্বিতীয় চাবিকাঠিতে পৌঁছে দেয়: সাহচর্য
রাসূল (সা) জোর দিয়ে বলেছেন যে উত্তম সাহচর্য হলো জীবনের সত্যিকার সুখের মূল উৎস। তিনি বলেছেন:

“এই পৃথিবী স্বল্পকালের আবাস, এবং এখানে কারও জন্য সবচেয়ে উত্তম সম্পদ হলো ন্যায়পরায়ণ স্ত্রীর সাহচর্য।”
(ইবনে মাজাহ; ১৮৫৫)

সহচর্য

সাহচর্য কিংবা একসাথে চলার পর্যায়টি হুট করেই আসে না: এটা আসে দায়িত্ব কাঁধে নেয়ার সময়, একত্রে কাজের মাঝে এবং জীবনের উত্থান-পতনের সময় ভাগাভাগি করে নেয়ার সময়। দৈনন্দিন কাজে রাসূল (সা) যেভাবে অংশ নিতেন তা আমাদের জন্য একটি উদাহরণ। একবার আইশা (রা) কে জিজ্ঞেস করা হলো:
“রাসূল (সা) বাড়িতে কী করেন?

তিনি জবাব দিলেন:

“তিনি পরিবারকে তাদের বাড়ির কাজে সাহায্য করেন।”
(আল-বুখারী)
একত্রে কাজ করা এবং বড় কিংবা ছোটখাটো বিষয়েও সাহায্য করা- এগুলো যেন কোনো দম্পতির বন্ধনে লাগানো সিমেন্ট, যা তাদের সম্পর্ককে আরও শক্ত করে। এভাবেই তাদের মাঝে একে অপরের প্রতি বিশ্বাস এবং ভালোবাসা গড়ে ওঠে। দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে উপকারী রেসিপি।
সাহচর্যের মাধ্যমেই একে অপরের প্রতি সহানুভূতি আরও মজবুত হয়; যেটি এই সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায় যে তারা একজন আরেকজনের অংশ। আল্লাহ কুরআনের মাধ্যমে আমাদেরকে এটি শিখিয়েছেন যে ল, তিনি আমাদের মধ্য থেকে আমাদের জন্য স্বামী / স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন। এভাবে একে অপরকে নিজেদের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আমরা একে অপরের মাঝে প্রশান্তি আনি। এটি জান্নাত অনুভবের কাছাকাছি : পারস্পরিক ভালবাসা এবং স্নেহময় প্রশান্তি।
সহানুভূতি

সহানুভূতি প্রতিফলিত হয় দয়ালু এবং স্নেহপূর্ণ আচরণে: আল্লাহ বলেছেন এটিই বিয়ের প্রকৃত আনন্দের ভিত্তি। রাসূল (সা) – তার সাহাবী এবং স্ত্রীদের প্রতি সহানুভূতিতে পূর্ণ ছিলেন: পরিবারের প্রতি এত সহানুভূতিশীল এবং ভালবাসা প্রকাশে তার মতো আর কেউ এত অগ্রগামী ছিলেন না৷ আয়েশা (রা) আরও বলেছেন যে রাসূল (সা) এই বিষয়ে ছিলেন ধারাবাহিক এবং তাঁর মাঝে অন্যান্য চমৎকার সব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিল।
সমঝোতা

দাম্পত্য জীবনে সুখী হওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল আপোষ বা সমঝোতা। এটি কেবল একজনের দুর্বলতা এবং তার স্বামী/স্ত্রীর দৃঢ়তা সম্পর্কে সচেতনতা বা উচ্চতর আধ্যাত্মিক সচেতনতা- যেমন নবী করীম (সা)- থেকে আসতে পারে।
এটি ছিল ঐক্য জোরদার করার ক্ষেত্রে নবীজীর সাফল্যের রহস্য, এবং এই একই নীতি তিনি বিবাহির জীবনে সুখ ও শান্তি অর্জনের জন্য বাস্তবায়ন করেছেন। সত্যিকারের সমঝোতার অর্থ হল- উভয় পক্ষই সম্মানিত বোধ করবে এবং তাদের চাহিদা পূরণ করা হবে।
উভয়ই বিনিয়োগের যোগ্য এমন একটি সম্পর্ক খুঁজে পেতে বাধ্য, কারণ এটি ভালবাসা এবং শ্রদ্ধার জন্য তাদের অন্তরের হাহাকার পূর্ণ করে। এ কারণেই নবী (সা) যখন তার প্রিয় স্ত্রীর সাথে একটি বিষয় নিয়ে তর্ক – বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন, তখন তিনি এই সমস্যা সমাধানের জন্য তৃতীয় পক্ষ খুঁজে বের করার পরামর্শ দেন। আপনি ভাবতে পারেন: কিভাবে নবী নিজের জন্যই এই কাজ করতে পারেন? তিনি আমাদের সবার জন্য একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করার জন্য এটি করেছিলেন: দম্পতি নিজে কোনোকিছু করতে না পারলে দাম্পত্য সমস্যা সমাধানের এটিই উপায় – আমাদেরকে মুখ খুলতে ইচ্ছুক হতে হবে।
দোষ ক্রুটির এই উন্মুক্ততা অন্যের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করা উচিত; প্রায়শই একজন স্বামী এবং স্ত্রী তাদের নিজস্ব সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে বাধা পড়েন। তাওহীদ আমাদেরকে বৃহত্তর চিত্রটি দেখতে এবং বৃহত্তর বাস্তবতার দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়গুলি বিবেচনা করতে শেখায়। এটি সত্য এবং ন্যায়বিচারের কাছাকাছি অপেক্ষাকৃত উন্নত দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
সন্তুষ্টি

পরিশেষে, সুখী দাম্পত্য জীবনে ‘সন্তুষ্টি’ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বিয়ে কিংবা জীবনের যেকোনো পর্যায়েই সন্তুষ্ট হওয়া ছাড়া সুখ লাভ করা যায় না। সন্তুষ্টি হলো আল্লাহর নিয়ামতের প্রতি কারও আন্তরিক প্রশংসা এবং রবের হুকুমের উপর বিশ্বাসের ফলাফল। রাসূল (সা) বলেন:
“বস্তুগত প্রাচুর্য কখনো সমৃদ্ধি নয়, বরং হৃদয়ের প্রাচুর্যই হলো প্রকৃত সমৃদ্ধি।”
(মুসলিম)
প্রতিনিয়ত ধারাবাহিকভাবে আল্লাহর সাথে দৃঢ় সম্পর্ক গড়ার প্রচেষ্টা এবং সাহচর্য, সমঝোতা, সহানুভূতি, সন্তুষ্টির এই নীতিগুলোর প্রাত্যহিক অনুসরণের মাধ্যমেই একটি দম্পতি বিবাহিত জীবনে সুখী হবে এবং উদযাপনের বিভিন্ন মুহূর্তে রঙিন হয়ে উঠবে।

শাইখ আহমাদ কুট্টি সম্পর্কে
শাইখ আহমাদ কুট্টি কানাডার ওন্টারিওতে অবস্থিত ইসলামিক ইনস্টিটিউট অব টরেন্টো’র একজন ইসলামিক স্কলার এবং সিনিয়র লেকচারার।

সম্পর্কিত আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

অনুস্মরণ করুন

5,535FansLike
1,200FollowersFollow
2,000SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ নিউজ