29 C
Dhaka
Saturday, July 2, 2022

Buy now

চীন-অস্ট্রেলিয়ার আধিপত্যের লড়াইয়ে জিতবে কে?

প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জজুড়ে সম্প্রতি এক ঝটিকা সফর শেষ করেছেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। তার এ সফরকে দেখা হচ্ছে এই অঞ্চলের ১০টি দেশের সঙ্গে বড় ধরনের বাণিজ্য ও নিরাপত্তা চুক্তি করতে বেইজিংয়ের আগ্রহের প্রতিফলন হিসেবে। তবে আধিপত্য বিস্তারে চীনের সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অস্ট্রেলিয়া।

প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জজুড়ে সম্প্রতি এক ঝটিকা সফর শেষ করেছেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। তার এ সফরকে দেখা হচ্ছে এই অঞ্চলের ১০টি দেশের সঙ্গে বড় ধরনের বাণিজ্য ও নিরাপত্তা চুক্তি করতে বেইজিংয়ের আগ্রহের প্রতিফলন হিসেবে। তবে আধিপত্য বিস্তারে চীনের সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অস্ট্রেলিয়া।

সাইবার নিরাপত্তা থেকে শুরু করে চীনা অর্থায়নে পুলিশ প্রশিক্ষণ একাডেমি নির্মাণ এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে আরও চীনা সাংস্কৃতিক সংযোগ স্থাপনের মতো বিস্তৃত অনেক বিষয় ছিল উচ্চাভিলাষী এ চুক্তির আওতায়। অঞ্চলটিকে বেইজিংয়ের কাছে টানাই ছিল এ চুক্তির মূল লক্ষ্য।

তবে চুক্তিটির কিছু দিক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অনেক দেশ এতে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানানোর পর সম্প্রতি তা স্থগিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

মুখের ওপর এভাবে ‘না’ বলার পর বেইজিংয়ের প্রশান্ত মহাসাগরীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষা কী ব্যর্থ হয়েছে? চীন কী আপাতত তাদের লক্ষ্য থেকে সরে এসেছে? বেইজিংয়ের আগ্রহের কেন্দ্রে থাকা এই বাণিজ্য ও নিরাপত্তা চুক্তি স্থগিত হওয়ার পর উঠছে এ ধরনের নানা প্রশ্ন।

ক্রমবর্ধমান আগ্রহ

দীর্ঘকাল ধরে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের ওপর নজর চীনের। ২০০৬ সাল থেকে এ অঞ্চলে ক্রমাগতভাবে বাণিজ্য, সাহায্য, কূটনৈতিক এবং বাণিজ্যিক কার্যকলাপ বাড়িয়ে আসছে দেশটি। সিডনিভিত্তিক স্বাধীন থিংক ট্যাঙ্ক লোই ইনস্টিটিউটের তথ্য বলছে, ২০০৬ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ঋণ এবং বিভিন্ন ধরনের অনুদানসহ এই অঞ্চলে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা দিয়েছে বেইজিং।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল নিয়ে চীনের এই আগ্রহের অনেক কারণ রয়েছে।

লোই ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক মিহাই সোরার মতে, ‘ঐতিহাসিকভাবে, সংঘাতের সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ভৌগলিকভাবে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই অঞ্চলের মাধ্যমে সরবরাহ ও প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।’

এই বিশ্লেষক বলেন, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রভাব অর্জনে সফল হওয়ার অর্থ হলো-আপনার এমন একটি আঞ্চলিক ব্লক আছে যা জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন ইস্যুতে নেয়া সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আপনার অবস্থানকে অনেক আরও বেশি শক্তিশালী করে তুলতে পারে।

সোরা যোগ করেন, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জে চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষাগুলো মূলত ‘তাইওয়ানের প্রতি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সমর্থন কমাতে দীর্ঘমেয়াদী প্রচারণার’ অংশ। গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশ তাইওয়ান ইস্যুতে তাদের কূটনৈতিক অকস্থান পরিবর্তন করে চীনের দিকেই ঝুঁকেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

লোই ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক সোরা আরও বলেন, সবশেষ বিষয় হলো সম্পদ। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন সম্পদের প্রধান ক্রেতা চীন। কারণ দেশটির উন্নয়নের জন্য এই সম্পদ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর এই সম্পদের নির্বিঘ্ন প্রবেশ নিশ্চিত করা বেইজিংয়ের কাছে অন্যতম অগ্রাধিকারমূলক বিষয়।

কিন্তু চীনের প্রশান্ত মহাসাগরীয় এই স্বার্থ অস্ট্রেলিয়ায় ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। কারণ ঐতিহ্যগতভাবেই দেশটি প্রশান্ত মহাসাগরকে মনে করে তার ‘ব্যাকইয়ার্ড’ বা ‘পেছন দিকের উঠান’।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, চীনের প্রভাব কমাতে ক্যানবেরা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সহায়তা বাড়িয়েছে। এই অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে পুনরায় যুক্ত হতে ২০১৮ সালে ‘প্যাসিফিক স্টেপ-আপ’ নীতি চালু করে অস্ট্রেলিয়া। শুধু তাই নয়, মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো তহবিলও চালু করে দেশটি। ক্যানবেরার এই পদক্ষেপকে দেখা হয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ঋণ এবং ব্যয়ের পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে।

কিন্তু চলতি বছরের শুরুর দিকে সলোমন দ্বীপপুঞ্জের সাথে একটি নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষর করে চীন। আর এই চুক্তিকে ৮০ বছরের মধ্যে ‘প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অস্ট্রেলিয়ান পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা’ বলে অভিহিত করে অস্ট্রেলিয়ার লেবার পার্টি।

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই’র সফরের সঙ্গে মিল রেখে সম্প্রতি ফিজি সফর করেন অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং, যা দুই দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতারই লক্ষণ। এ ছাড়া সামোয়া ভ্রমণেও যান অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী। গত মাসের শুরুতে শপথ নেয়ার পর থেকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এটি তার দ্বিতীয় সফর।

‘আঞ্চলিক শৃঙ্খলায় পরিবর্তন’

লোই ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক মিহাই সোরার দাবি, যে চুক্তিটি স্থগিত করা হয়েছে সেটি বাস্তবায়িত হলে ‘আঞ্চলিক শৃঙ্খলায় বড় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা ছিল’।

খসড়া ওই চুক্তির ফাঁস হওয়া একটি সংস্করণে দেখা যায়, দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে বেইজিংয়ের। আরও বেশি আর্থিক সহায়তা থেকে শুরু করে পুলিশকে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং চীন-প্রশান্ত মহাসাগরীয় একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল তৈরি করা যার অন্তর্ভুক্ত ছিল।

নিউজিল্যান্ডের ম্যাসি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সিনিয়র লেকচারার ড. আনা পাউলেস বলেন, আঞ্চলিক পুলিশিং বা পুলিশকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিষয়ে চীনের প্রস্তাবিত সহযোগিতা প্রস্তাব প্রমাণ করে যে দেশটি আঞ্চলিক নিরাপত্তায় নতুন ধারা সৃষ্টি করতে আগ্রহী। যদিও বেইজিং কীভাবে বিষয়টি বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিল তা পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। এ ছাড়া চুক্তিতে উল্লেখিত সাইবার নিরাপত্তার বিষয়টি জাতীয় নিরাপত্তায়ও উদ্বেগ সৃষ্টি করে।

অন্যদিকে মিহাই সোরার মতে, ওই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলে আঞ্চলিক সহযোগিতার বিদ্যমান সম্পর্ক জটিল হয়ে উঠত। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে অন্যদের সম্পর্কে এর বড় প্রভাব পড়ত।

যদিও কিছু দেশ এই চুক্তির প্রতি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ফেডারেটেড স্টেটস অব মাইক্রোনেশিয়ার (এফএসএম) প্রেসিডেন্ট বলেন, চীনের ওই প্রস্তাবটি ‘অসৎ’ ছিল। পাশাপাশি এটি বাস্তবায়িত হলে সরকার এবং বড় বড় শিল্পের ওপর চীনা প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হতো।

ফিজি, সামোয়া, নিউই, এফএসএম এবং পালাউর পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতি এটা নিশ্চিত করে যে চুক্তিতে সম্মতির ব্যাপারে দেশগুলো বেশ উদ্বিগ্ন ছিল। এর সরাসরি ফল হিসেবেই প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলো ওই চুক্তিতে সই করা থেকে বিরত থেকেছে।

প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অস্ট্রেলিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর এবং সহায়তা বৃদ্ধির ঘোষণা কী চীনের ওই চুক্তির ফলাফলের ওপর কোনো প্রভাব ফেলেছিল? এমন প্রশ্ন করা হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটির ড. টেস নিউটন কেইনকে। জবাবে তিনি বলেন, ‘না। এটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সম্মিলিত ক্রিয়াকলাপের ফল ছিল, যা এ অঞ্চলের সার্বভৌমত্বের প্রতীক।’

এরপর কী?

ম্যাসি বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. আনার মতে, ‘এটি (চুক্তি স্থগিত হওয়া) অবশ্যই ইঙ্গিত দেয় যে আঞ্চলিক পর্যায়ে চীনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। তবে আমরা আশা করতে পারি যে চীন এখন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক দ্বিগুণ করবে।’

চুক্তিটি স্থগিত হওয়ার খবর প্রকাশ হওয়ার পর নিজেদের অবস্থান জানিয়ে এক বিবৃতি প্রকাশ করেছে চীন। এতে বলা হয়, বেইজিং এখনো প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে তার ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও গভীর করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীনের তাৎক্ষণিক ওই বিবৃতি এটা প্রমাণ করে যে বহুপাক্ষিকভাবে কাজ এগিয়ে নেয়ার পাশাপাশি এ চুক্তি সংক্রান্ত আলোচনা অব্যাহত রাখতে চায় চীন। প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের বিভিন্ন উদ্যোগে অনুদান দেয়া এবং দেশগুলোর সঙ্গে নিরন্তর যোগাযোগ রাখার চেষ্টা, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ঘিরে বেইজিংয়ের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সামনে এগিয়ে নেয়ার পরিকল্পনারই সুস্পষ্ট ইঙ্গিত।

বিশ্লেষক মিহাই সোরার মতে, ‘আমি মনে করি, এটা স্পষ্ট যে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীন যা চেয়েছিল তার চেয়ে বেশি পেয়েছে। ফলে এ অঞ্চলে নিরাপত্তা উপস্থিতি প্রতিষ্ঠার জন্য দেশটির দীর্ঘমেয়াদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে যাবে।’

সম্পর্কিত আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

অনুস্মরণ করুন

5,535FansLike
1,200FollowersFollow
2,000SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ নিউজ